Homeঅন্যান্যমুনীর চৌধুরীর  জীবন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক শক্তি

মুনীর চৌধুরীর  জীবন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক শক্তি

Tfq5AEXUFuMJL7qb_8d11c_e0466fd18f_long

মুনীর চৌধুরী (জন্ম: ২৭ নভেম্বর ১৯২৫, মানিকগঞ্জ  মৃত্যুবরণ: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) ছিলেন বাংলাদেশের এক প্রতিভাবান শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্য সমালোচক এবং বাঙালি জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সৈনিক।  তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে; ১৯৫০ সালে তিনি Dhaka University এর  ইংরেজি ও বাংলা বিভাগে যোগ দেন, এবং পরে ১৯৭১ সালে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ডীন হিসেবে নিযুক্ত হন। 

নাট্যচর্চা ও আধুনিক বাংলা থিয়েটার নির্মাণ

চৌধুরীর সাহিত্যজগতে প্রবেশ ছিল ছোটগল্প লেখার মধ্য দিয়ে; কিন্তু তিনি শীঘ্রই নাট্যচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষত “একাঙ্ক নাটক” (one-act play) এর দিকে তাঁর মনোযোগ ছিল প্রবল। 

তাঁর সবচেয়ে খ্যাতনামা কাজ হচ্ছে কবর (English: The Grave)  একটি প্রতিরোধাত্মক নাটক, যা জেলখানায় লেখার পর বন্দিদের অভিনয় করেই প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল।  “কবর” নাটকে তিনি ১৯৫২ সালের Bengali Language Movement এর ইতিহাস ও বাঙালি ভাষা চেতনার সংগ্রামকে নাট্যরূপে তুলে ধরেন। নাট্যকার হিসেবে এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল (protest) নাটক, যা সমাজ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখায়। 

এরপর তিনি রচনা করেছিলেন আরও উল্লেখযোগ্য নাটক, যেমন রক্তাক্ত প্রান্তর (Roktakto Prantor, 1959), চিঠি (Chithi, 1966), পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য (Palashi Barrack O Onyanno, 1969) ইত্যাদি। 

তাঁর নাটকগুলোতে কেবল বিনোদন ছিল না; সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা, ভাষা সাংস্কৃতির অধিকার, জনগণের বিকাশ এবং ন্যায়বিচার সবকিছুই ছিল পরিস্কার। 

সমাজ রাজনীতি ও সাহিত্যের মিশেল প্রভাবে পাঠক সমাজ ও দেশের সাহিত্য জগৎ তার নন্দনের আলোকে সমৃদ্ধ হচ্ছিলো। 

 

ভাষা–চেতনা, সংস্কৃতি এবং সমাজ: একটি দায়িত্ববোধ

মুনীর চৌধুরী শুধু একজন নাট্যকার বা শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার ক্ষেত্রে ছিলেন সক্রিয় এক সংস্কারক। ১৯৬৫ সালে তিনি বাংলা টাইপরাইটারের কীবোর্ড পুনর্নির্মাণে অংশ নেন  যা বাংলা ভাষার লেখন ও কাজকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়েছিল। 

১৯৬৭ সালে যখন পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল, চৌধুরী দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি–চর্চা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষার আত্মদায়িত্ব নিয়েছিলেন। 

তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য ও থিয়েটার শুধু সৌন্দর্য বা বিনোদন নয় সমাজের অন্তর্নিহিত চাহিদা, দলিলিক ইতিহাস, মানুষিক সত্য ও ন্যায়ের জন্য শব্দ ও নাট্যকে শক্তিশালী দিক। 

ভাষার প্রতি এই দখল তার প্রভাবকে করেছে দীর্ঘ। 

শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্মরণ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১  স্বাধীনতার মাত্র দু’দিন আগে মুনীর চৌধুরীকে পাশবিকভাবে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী তখন, এবং বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম শিকার। তাকে হারিয়ে বাংলার নন্দন অঙ্গনে হয়েছিলো অপূরণীয় ক্ষতি। 

স্বাধীনতার পর, ১৯৮০ সালে তাকে দেওয়া হয় Independence Day Award স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান। 

তার নাটক, ভাষাচর্চা, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং সাহসী বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁর জীবন এখনো বাঙালি জাতির জন্য প্রেরণার উৎস। আধুনিক বাংলা নাট্যসাহিত্য, সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও ভাষা গৌরবের ধারায় মুনীর চৌধুরীর অবদান অমলিন। তিনি আমাদের জন্য সেই যাদুকর যিনি শব্দ ও রূপের মাধ্যম থেকে সংগ্রাম ও বীরত্বের ইতিহাস গড়েছেন। তার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে গেছে আমাদের পুরো সাহিত্য জগৎ।