Last updated: নভেম্বর ৩০, ২০২৫ at ০৩:১২ পূর্বাহ্ণ

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্প্রতি আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে। সমাবেশে উপস্থিত হয়ে কালের কণ্ঠকে বক্তব্য দেন ফারহাদ মজহার, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “ওনারা তো পালাগানের মধ্যে আছে। বাউলরা তো কোনো হিংসায় বিশ্বাস করে না। তো, এটাকে আপনি ইস্যু বানাচ্ছেন কেন? উদ্দেশ্য হলো, যে নির্বাচনটা আসছে, একটা শ্রেনি মনে করে ইসলাম নিয়ে কথা বললে সে ভোট বেশি পাবে। আর তো কোনো কারণ নাই, আর কী কারণ?”
মজহার এখানে বাউলদের প্রকৃতি ও সামাজিক অবস্থানকে তুলে ধরেছেন। বাউলরা বাংলার লোকসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক ধারার একজন শান্তিপ্রিয় প্রতিনিধি। তাদের মূল কর্মপ্রণালী হলো সংগীতের মাধ্যমে মানবতা, ভালোবাসা এবং সামাজিক একতা প্রচার করা, যা কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংঘাতের সঙ্গে জড়িত নয়। মজহারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেফতার বা বিরোধ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচনী সময়কালে ভোটের স্বার্থে ইস্যু বানানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই সমাবেশে উপস্থিতরা শিল্পীর মুক্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন। বক্তারা উল্লেখ করেছেন যে, সাংস্কৃতিক শিল্পীরা সমাজের শান্তিপ্রিয় উপাদান এবং তাদের নির্যাতন বা গ্রেফতার শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং সমাজে একটি ভীতিকর বার্তাও দিচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাউল শিল্পীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার লোকসংস্কৃতিকে রক্ষা ও সম্প্রসারণে অবদান রেখেছেন। তাদের পালাগান শুধুই সঙ্গীত নয়, এটি একটি জীবনদর্শন, যা সমাজে সংহতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক চেতনা প্রচার করে। রাজনৈতিক মহল এই শান্তিপ্রিয় ধারা ব্যবহার করে ভোট অর্জনের প্রয়াস দেখাচ্ছে, যা মূল উদ্দেশ্যকে বিপথগামী করছে। মজহারের বক্তব্য তাই শুধু শিল্পীর মুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টির বিষয়টিকেও প্রকাশ করছে।
এ ধরনের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা উচিত। বাউলদের মতো শিল্পীরা কোনো দলের বা ধর্মীয় ন্যারেটিভের অংশ নয়; তারা সমাজের একটি নিরপেক্ষ, মানবিক ও সংস্কৃতিক অংশ। তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা।
ফারহাদ মজহার সমাবেশে আরও বলেন যে, নির্বাচনী সময়কালে এমন বিষয়গুলো ইস্যু বানানো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এটি শুধু ভোটের খেলাই নয়, বরং ধর্ম, সংস্কৃতি এবং শিল্পকে বিভাজনের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমাবেশের লক্ষ্য ছিল সাধারণ জনগণকে সচেতন করা এবং শিল্পীর প্রতি সমর্থন দেখানো। এই ধরনের শান্তিপ্রিয় প্রতিবাদ দেখায় যে, সমাজে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং মানবিক চেতনা এখনও শক্তিশালী।
সর্বোপরি, বাউল শিল্পী আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে এই প্রতিবাদ সমাবেশ একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি শুধু একজন শিল্পীর মুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সমাজে শান্তিপ্রিয় চেতনা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বনাম নৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সংঘাতকেও তুলে ধরেছে। বাউলদের শান্তিপ্রিয় জীবনদর্শন, শিল্প ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রাজনৈতিক চক্রান্তের বাইরে থাকা উচিত।

বহুস্বর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বিকাশে নিবেদিত পোর্টাল। দেশ-বিদেশের সকল সংস্কৃতির সহাবস্থানসহ সাংস্কৃতিক সংহতিতে বহুস্বর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
277/5 Shaheed Janani Jahanara Imam Smarani (Katabon Dhal), New Market, Dhaka–1205.
Bohuswar © 2025. All Rights Reserved.