Homeআন্তর্জাতিকদ্রৌপদী মুর্মু ও ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’: প্রতিনিধিত্ব, মূল্যবোধ ও প্রাসঙ্গিকতা

দ্রৌপদী মুর্মু ও ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’: প্রতিনিধিত্ব, মূল্যবোধ ও প্রাসঙ্গিকতা

Droupadi_Murmu_official_portrait,_2022

২৮ নভেম্বর ২০২৫, ব্রহ্মকুমারীদের ২০২৫–২৬ সালের বার্ষিক থিম “বিশ্ব ঐক্য ও বিশ্বাসের জন্য ধ্যান” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু আবারও স্মরণ করালেন প্রাচীন ভারতীয় নৈতিক ধারণা “বসুধৈব কুটুম্বকম”— অর্থাৎ “পৃথিবী একটি পরিবার”। তাঁর মতে, দ্রুত বদলে যাওয়া বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই দর্শন আজ আরও জরুরি।

দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, মানুষ বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়, ডিজিটাল উন্নয়ন কিংবা মহাকাশ গবেষণায় অনেক এগোলেও— মানসিক শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তাই বাহ্যিক উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মিক শান্তিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


প্রেক্ষাপট: বিশ্ব সংকট ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব

আজকের বিশ্ব রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়সহ নানা চাপে আক্রান্ত। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থাকলেও মানুষের জীবনে—

  • একাকিত্ব
  • মানসিক অস্থিরতা
  • সামাজিক দূরত্ব
  • বিশ্বাসের সংকট

—এসব বাড়ছে।

দ্রৌপদী মুর্মুর মতে, এই সময়ে মানুষের “নিজের ভেতরের দিকে তাকানো” অত্যন্ত জরুরি— অর্থাৎ আত্মপর্যালোচনা, মানসিক প্রশান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের ফিরে আসা। “পৃথিবী এক পরিবার”— এই দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করলে বিভেদ, বৈষম্য ও অবিশ্বাস দূর করা সম্ভব।


‘বসুধৈব কুটুম্বকম’: ইতিহাস ও নৈতিক বার্তা

“বসুধৈব কুটুম্বকম” প্রাচীন সংস্কৃত ধারণা— যেখানে বলা হয়, পৃথিবীর সব মানুষ, প্রাণী ও জীবজগৎ একই পরিবারের সদস্য।

এই দর্শন—

  • শুধু ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়,
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি, সামাজিক সংহতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্বায়নের চাপ, জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময়ে এই ধারণার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।


দ্রৌপদী মুর্মুর বক্তব্য: মূল দিকগুলো

১. বাহ্যিক উন্নয়ন মানসিক শান্তি আনে না

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে উন্নতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো দিয়ে মানসিক শান্তি, সামাজিক বন্ধন বা আত্মিক প্রশান্তি পাওয়া যায় না।

২. সমাধান—উন্নয়ন ও মূল্যবোধের সমন্বয়

ধ্যান, আত্ম-অনুধাবন, মানবিকতা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক সম্প্রীতি—এসবকে উন্নয়নের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে।

৩. প্রাচীন মূল্যবোধের আধুনিক প্রয়োগ

ভারতের দার্শনিক ঐতিহ্যে যে “এক পরিবার” ভাবনা ছিল, আজকের সংকটপূর্ণ সময়েও তা সমানভাবে কার্যকর হতে পারে।


প্রাসঙ্গিকতা ও চ্যালেঞ্জ

কেন প্রাসঙ্গিক?

  • বৈশ্বিক সংকটের সমাধান শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে হয় না; মানবিকতা ও একাত্মবোধ প্রয়োজন।
  • প্রযুক্তির যুগে মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক বন্ধন রক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
  • বিশ্বায়নে ন্যায়, সমতা ও মানবাধিকারের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চ্যালেঞ্জ কী কী?

  • রাজনৈতিক স্বার্থ, জাতিগত বিভাজন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা “পৃথিবী এক পরিবার” ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে।
  • কেবল স্লোগান দিলে হবে না; বাস্তব প্রয়োগে প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণতা, সমতা ও পরিবেশ সচেতনতা।
  • ধ্যান বা আত্মিক অনুশীলন সব সমাজে একইভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

সমাপনী: মানবিক ভবিষ্যতের লক্ষ্য

বিশ্ব যখন নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ভবিষ্যৎকে কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দাঁড় করালে চলবে না। মানুষের মানসিক শান্তি, সামাজিক বন্ধন, বিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধই একটি টেকসই সমাজের মূল ভিত্তি।

দ্রৌপদী মুর্মুর আহ্বান তাই অতীতের কোনো স্মৃতি নয়— ভবিষ্যতের মানবিক পথনির্দেশ। উন্নয়নের সঙ্গে যদি মানবিকতা ও আত্মিক শান্তির ভিত্তি মজবুত করা যায়, তবে “পৃথিবী এক পরিবার”— শুধু দর্শন নয়, বাস্তব রূপও পেতে পারে।