Homeশিল্প ও সাহিত্যআন্তঃসংস্কৃতি প্রেম: বাংলা ও বিদেশি সত্তার দূরত্ব ঘেঁষা এক সাহিত্যিক সম্পর্ক

আন্তঃসংস্কৃতি প্রেম: বাংলা ও বিদেশি সত্তার দূরত্ব ঘেঁষা এক সাহিত্যিক সম্পর্ক

Inter-Cultural Romance প্রকাশিত হয়েছে BOHUSWAR

দ্য ডেইলি স্টার–এর বই ও সাহিত্য বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে “আন্তঃসংস্কৃতি প্রেম” শিরোনামের একটি বিশেষ পর্যালোচনা, যেখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে Barisal and Beyond: Essays on Bangla Literature (ইউপিএল, ২০২৫) গ্রন্থটি। রিভিউটি বইটির লেখকের জীবনযাপন, তার বাংলাপ্রীতি এবং সাহিত্যচর্চার গভীর আকর্ষণকে সামনে এনেছে।

পর্যালোচক কায়সার হক লিখেছেন—বইটির লেখক, যিনি পেশায় যুক্তরাষ্ট্রের এক শিক্ষক, ১৯৬৩–৬৫ সালে শান্তি বাহিনীর সদস্য হিসেবে বরিশালে কাজ করতে এসে প্রথম বাংলার সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষা শেখা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আড্ডা, সাহিত্য নিয়ে কথা বলা—এসব মিলিয়ে বাংলা তার জীবনের অন্তরমহলে জায়গা করে নেয়।


বইটি: ভাষা, মনন ও সংস্কৃতির হৃদ্যতামূলক মিলন

“বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড” কেবল গবেষণাধর্মী প্রবন্ধসংকলন নয়; এটি পশ্চিমা পরিচয় ও বাংলা ভাবনার অন্তরঙ্গ মেলবন্ধনের গল্প। লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—ভাষা শেখা, মানুষের সঙ্গে নিবিড় আলাপ, সাহিত্যচর্চার আকর্ষণ—সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি এক আন্তঃসংস্কৃতি যাত্রার দলিল।

যদিও লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা উদ্ভিদবিজ্ঞানে, তবু বাংলার টান, মানুষের সান্নিধ্য, কথোপকথন, সাহিত্যচর্চা—সব মিলিয়ে তিনি বাংলা সমাজকে অনুভব করেছেন গভীরভাবে। এটি তার কাছে কেবল ভাষাশিক্ষা ছিল না; ছিল অনুভূতি, মানুষের গল্প এবং বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের নরম স্পন্দন।

পর্যালোচকের মতে, এই মেলবন্ধন “মনোমুগ্ধকর” এবং “অস্বাভাবিকভাবে সুন্দর”।


কেন এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভাষা, পরিচয় ও সংস্কৃতি—এগুলো সবসময়ই সংবেদনশীল ও রাজনৈতিক মাত্রা বহন করে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন বিদেশি ব্যক্তি যখন নিজের সাংস্কৃতিক অবস্থান বজায় রেখেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন—তখন তা প্রমাণ করে যে ভাষা কখনোই জাতিগত সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়।

এতে প্রমাণ হয়—

  • সাহিত্য মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে,
  • ভাষা মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়,
  • আর সাংস্কৃতিক বিনিময় গভীর মানবিক বোঝাপড়া তৈরি করে।

বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক সময় বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংলাপের পথ তৈরি হয়।


তবু কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়

এ ধরনের আন্তঃসংস্কৃতি সম্পর্ক সবসময় সহজ হয় না। কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—

  • বিদেশির এই আগ্রহ কতটা স্থায়ী?
  • ভাষা শেখা ও সাহিত্যচর্চার পথে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা কতটা কঠিন?
  • এই সম্পর্ক কি কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায় সীমাবদ্ধ, নাকি সমাজে নতুন আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে?

বাংলা ভাষা ও উপমহাদেশীয় পরিচয়ের জটিল রাজনীতির ভেতর একজন বাইরের মানুষ কতটা জায়গা করে নিতে পারেন—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।


শেষ কথা: অভিজ্ঞতার মধ্যেই রূপান্তরের সম্ভাবনা

দ্য ডেইলি স্টারের এই পর্যালোচনা কেবল একটি বইকে কেন্দ্র করে লেখা হয়নি; বরং ভাষা, সংলাপ ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ভাবনার দিক নির্দেশ করে। যখন একজন বিদেশি বাংলা শেখেন, বাংলা সাহিত্য পড়েন এবং বাঙালি মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতার বন্ধন গড়ে তোলেন—তখন তা বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে—

  • নান্দনিক মুক্তির পথ,
  • বৌদ্ধিক সংযোগের নতুন জানালা,
  • এবং বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলা সাহিত্যের প্রসারের সম্ভাবনা।

ভাষা ও সাহিত্য তাই কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং মানুষের ভেতরের আলো—যা দূরের হৃদয়েও পৌঁছতে পারে।